priyo.com

. মোহাম্মদ কায়কোবাদ

অধ্যাপক, সিএসই বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

২১ জুলাই ২০১৭
নানা দেশে ভ্রমণ করে আমার এই ধারনা জন্মেছে যে, বিশেষ করে আমাদের মতো সীমিত সম্পদের দেশে অনেক কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে কম্পিউটার সরঞ্জামাদি কিংবা সফটওয়ার ক্রয়ে আমাদের সীমাহীন আগ্রহ থাকলেও তার পরিপূর্ণ ব্যবহারে আমরা আন্তরিক নই। একবার হংকংয়ের এক অধ্যাপক বলেই বসলেন, ‘তোমাদের দেশ তো গরিব। এর মানে কি এই নয় যে তোমরা তোমাদের কম্পিউটার সেন্টার পালাক্রমে সারা দিনরাত ব্যবহার কর।’ প্রথম বাক্যের সাধারণত বিরোধিতা করে থাকি, কিন্তু দ্বিতীয় বাক্যে আমি লা জবাব। আমাদের কাছে চাবি থাকে তালা বন্ধ করার জন্য, খোলার জন্য নয়।

 

আমাদের হাতে ১২ কোটি মোবাইল, ঋণগ্রস্ত দেশের নাগরিকদের অনেকটা পদ্মাসেতু হাতে কিংবা পকেটে নিয়ে চলার মতো বাবুয়ানা। প্রতিটি মোবাইলের জন্য বিদেশে টাকা পাচার করতে হয়। একটি মোবাইল সম্ভবত ১০০ জনকে সেবা দানে সক্ষম হলেও প্রযুক্তিটি এমনই যে কেবল এর ধরনের জন্য একজনই ব্যবহার করতে পারে। মোবাইল যোগাযোগের ফলে আমাদের রাজধানীতে যানজটের যে উপশম হচ্ছে তারও কোনো প্রমাণ নেই। বাংলাদেশে মোবাইল তৈরির একটি কারখানা থাকলেও না হয় তা নিয়ে গর্ববোধ করতে পারতাম।

 

প্রতি বছর হাজার হাজার কম্পিউটার ক্রয় করা হয় এবং তার অধিকাংশই যোগ্য ব্যবহারের অভাবে ফেলে রাখা হয়। দেশের মূল্যবান সম্পদ অবহেলায় নষ্ট করার সংস্কৃতিতে গা ভাসিয়ে দেওয়ার জন্য আমি শংকিত হই। একটি কম্পিউটারের যোগ্য ব্যবহার হাজার মানুষের শ্রমকে অপ্রয়োজনীয় করে ফেলতে পারে। একে তো দেশে বেকার মানুষ প্রচুর তারপর তাদের কাজ কম্পিউটার দিয়ে করালে বেকারত্ব বৃদ্ধি পাবে তাই তো স্বাভাবিক। আমাদের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে কম্পিউটার ব্যবহার করে মানুষের শ্রমকে শুধু অপ্রয়োজনীয় প্রমাণ করার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই। প্রকৃতপক্ষে শুধু মানুষের কাজগুলো করার জন্য কম্পিউটার ব্যবহারে কোনো বাহাদুরিও নেই। বরং যে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে আমাদের সিস্টেমের উন্নয়ন হবে, সিস্টেমের অনুকূলায়ন হবে, সিস্টেমের বিশ্লেষণ করে আমাদের জ্ঞান বুদ্ধি বৃদ্ধি পাবে এবং যেকাজগুলো সম্ভবত কম্পিউটার ছাড়া শুধু মানুষ দিয়ে করা অসম্ভব সেগুলো কম্পিউটারের মাধ্যমে করে সীমিত সম্পদের যুতসই ব্যবহারে দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়াই হবে কম্পিউটারের যোগ্য ব্যবহার। আমাদের শিক্ষাবোর্ড অফিসে আগে যারা নম্বর যোগ করে পাশ, ফেল, বিভাগের হিসাব করত, তাদের তো আর এখন সে কাজ করতে হয় না। এখন কী তাদের জন্য পর্যাপ্ত কাজ আছে?

 

আমরা ব্যাংকে কম্পিউটার ব্যবহার করব শুধু টাকা জমা এবং উঠানোর পর একাউন্টে কত টাকা রইল তা বের করার জন্য নয়, যা ব্যাংকের চাকুরিজীবীরা অনায়াসে করতে পারে। বরং আমানতকারীদের ব্যয়ের প্যাটার্ন বের করে ব্যাংকের গচ্ছিত মূলধনের সর্বোত্তম বিনিয়োগ নিশ্চিত করার জন্য, আকর্ষণীয় নীতিমালা প্রণয়ন করে আমানতকারীদের সঞ্চয়ী হতে উৎসাহিত করার জন্য। ব্যাংকের এতসব উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জ্ঞান আহরণ করা যা ব্যবহার করে অধিকতর উপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে, সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা যেতে পারে। বর্তমানে দেশে বেশিরভাগ গুরত্বপূর্ণ ব্যাংক খেলাপি ঋণে জর্জড়িত। ব্যাংকের এই দুরবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সরকারও বেশ উদ্বিগ্ন। ঘটা করে ঢোল পিটিয়ে KYC (Know your customer) এর গুরুত্ব মুখে বললেও এটা যে কার্যকর করতে পারছি না, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কোনো এক ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানকে হাজার কোটি টাকা কেন ঋণ দিতে যাব, দেশে কি ঋণ আকাঙ্ক্ষীদের আকাল পড়ে গেছে? যেখানে বিদেশিদের দেশে বিনিয়োগের জন্য সরকার আকৃষ্ট করছে সেখানে আমাদের অর্থই ঋণ নিয়ে যদি সুইস ব্যাংকে জমা রাখা হয় সেটা কী সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ হলো? কোন প্রকল্পে অর্থায়ন করা যাবে, কাকে ঋণ দেওয়া যাবে তা সংশ্লিষ্ট তথ্যউপাত্তের বিশ্লেষণ করে ব্যাংকসমূহ যদি সম্ভাব্য ঋণখেলাপি সৃষ্টি নিরুৎসাহিত করতে পারত, তাহলে তো কম্পিউটারায়নের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুফল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা হয়নি। আমরা প্রতিবছর নিয়মিতভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সুবিধাবঞ্চিত চাকরিজীবীদের রেমিট্যান্স ও পোশাকশিল্পের বঞ্চিত শিল্পীদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে দামি কম্পিউটার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী, বিদেশি সফটওয়ার ক্রয় করছি এবং নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিকমানের বেতন ও পরামর্শ ফি দিয়ে বিদেশিদের নিয়োগ করছি, কিন্তু সেই বিশ্বমানের সফটওয়ার আর পরামর্শক আমাদের কম্পিউটারায়নের সুফল দিতে পারছে না। বিশ্ব টেলিযোগাযোগ সংস্থা কম্পিউটারায়নের মাপকাঠিতে নানা দেশকে যে র‌্যাংকিং দিয়ে থাকে তাতে আমাদের অবস্থান দেখলেই তা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

 

আমাদের দেশের পাবলিক পরীক্ষার ট্যাবুলেশন কম্পিউটারায়ন হয়েছে তাও দুই যুগ হয়ে গেল। কম্পিউটার বিজ্ঞানে আমরা বলে থাকি কম্পিউটার সিস্টেমের থেকেও তথ্য ও উপাত্ত মূল্যবান। আমরা কি এখনও তা প্রমাণ করতে পেরেছি? ছাত্রদের প্রাপ্ত নম্বর যোগ করে পাশ ফেল শুধু নির্ধারণ করতে হলে মানুষের ব্যবহারে বাধা দেখি না। তবে আমরা যদি জানতে চাই কোন বিভাগ, জেলা, উপজেলা কিংবা এলাকাভিত্তিক ক্ষুদ্র বিভাজনে নানা বিষয়ে পারদর্শী কিংবা দুর্বল ছাত্র কোথায়, অথবা ছাত্রদের পারফরমেন্সের ভিত্তিতে পাঠ্যপুস্তকের গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া, কোন এলাকার কোন বিষয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত, তাহলে সম্ভবত লক্ষ লক্ষ মানুষ নিয়োগ করেও তা করা সম্ভব হবে না, কম্পিউটারের শরণাপন্ন হতে হবে। সীমিত সম্পদের দেশে শিক্ষকদের বৃহৎ গোষ্ঠীকে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো সম্পদ আমাদের নেই, তাই এই সম্পদ কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে। তাছাড়া মাত্রাতিরিক্ত চাহিদার দেশে অস্বচ্ছতার ওপর ভর করে সম্পদ লোপাট করার মতো গোষ্ঠীরও অভাব নেই। এ কাজটি কার্যকরভাবে করার জন্য চাই যোগ্য কম্পিউটার সিস্টেম।

 

বর্তমান সরকার দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখাচ্ছে, বিশ্ব যেখানে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তখন আমাদের জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করার জন্যও সরকারের নানা কর্মসূচি রয়েছে। এরমধ্যে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার জন্য সরকারের উপবৃত্তি কর্মসূচি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে যেসকল উদ্যোগের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নে অন্তর্ভুক্ত করা যায় তার সকল ক্ষেত্রেই লাইনলস ভয়াবহ। এই লাইনলস সরকারকে অনুরূপ উদ্যোগ গ্রহণে নিরুৎসাহিত করে। এক্ষেত্রে প্রণোদনা সত্যিকারেই যোগ্য হাতে যাচ্ছে কিনা তা তদারকি করা দরকার। অতি সম্প্রতি রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির শিক্ষার্থীদের মায়ের মোবাইল একাউন্টে যাতে সরাসরি চলে যায়, এর জন্য প্রগতি সিস্টেমএর কারিগরি সহায়তায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের একটি কম্পিউটার সিস্টেম তৈরি হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত ১ মার্চ রূপালী ব্যাংক শিওর ক্যাশ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের শুভ উদ্বোধন করেন। এই উপবৃত্তির কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হবে ৬০ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৮০ হাজার গ্রাম, এক কোটি মা এবং এক কোটি ত্রিশ লক্ষ শিশু। প্রতি বছর ১,৪০০ কোটি টাকা পৌঁছে যাবে মায়েদের হাতে তাদের জন্য বিনা পয়সায় তৈরি ব্যাংক একাউন্টে। এরই মধ্যে শুধু ডিজিটাল ডেটাবেইস তৈরির ফলে মায়েদের নামে অন্যায়ভাবে সুবিধা নেওয়ার সংখ্যা ১৫% কমে গেছে। এই টাকা দিয়ে সুবিধাবঞ্চিত, অর্থনৈতিকভাবে কম অগ্রসর অধিকসংখ্যক পরিবারকে উপবৃত্তির আওতায় আনা যাবে।

 

আমরা জানি ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে আমাদের দেশের নারীরা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ক্ষমতায়নসহ উদ্যোক্তার ভূমিকায় আবির্ভূত হচ্ছে। দেশের উন্নয়নে এখন অর্ধেক মানুষ আর নীরব অসহায় দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে থাকবে না। গোটা জাতির অগ্রগতিতে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে। ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পসমূহ, পোশাকখাত যেমন নারীর ক্ষমতায়নে উল্ল্যেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে, মোবাইল ব্যাংক একাউন্টে উপবৃত্তির অর্থ নারীর ক্ষমতায়নের এমনই আরেকটি কার্যকর উদাহরণ। তবে এই উদ্যোগটি প্রযুক্তির দৃষ্টিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, আগের উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে আমরা নারীদের কম্পিউটারায়নের আওতায় আনতে পারিনি কিন্তু উপবৃত্তির কর্মসূচিতে তা হচ্ছে। প্রগতির তৈরি করা সিস্টেমের মাধ্যমে সারা দেশের কোটি মায়ের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব, তাদের নানা তথ্য মুহূর্তের মধ্যেই জানা সম্ভব। মায়েরা এই একাউন্ট থেকে শুধু টাকা তুলবেই না বরং টাকা সঞ্চয়ও করবে, দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখবে। মায়েদের যে ডেটাবেইস তৈরি হয়েছে তাতে ডেটা মাইনিং করে কত রকম তথ্যও যে বের হয়ে আসবে, তা কেবল সময়ই বলে দিতে পারবে। শোনা যাচ্ছে সুবিধাভোগী মায়ের সংখ্যা শিশুর সংখ্যার থেকেও বেশি। অর্থাৎ সরকারের এই উদ্যোগে অশুভ চক্র ভাগ বসাচ্ছে, এবং সেই চক্রটি যথেষ্ট বড়ও হতে পারে। এত বছর ধরে সরকার সম্ভবত প্রতিটি জেলায় কত টাকা উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে সেই সংখ্যাটি জানত, কতজনকে দেওয়া হতো তা জানার সুযোগ ছিল না, তাদের বৃত্তান্ত তো অনেক দূরের কথা। এখন আমরা জানতে পারব প্রতিটি স্কুলে, উপজেলায়, জেলায় কিংবা বিভাগে প্রতিটি শ্রেণিতে কতজন ছাত্র আছে। এর ফলে সরকারের বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণের মহাকর্মযজ্ঞ আরও কার্যকর হবে। বছরে আমাদের ৩৫ কোটি পাঠ্যপুস্তক লাগবে, না ৩০ কোটি লাগবেতা এখন আমরা এই উপবৃত্তির তথ্যভাণ্ডার থেকেই বলে দিতে পারব। প্রতিটি পুস্তক তৈরিতে যদি ৩০ টাকা খরচ হয় এবং পাঁচ কোটি পুস্তক কম তৈরি করতে হয় সেখানেও কিন্তু ১৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। এই সিস্টেমের ব্যবহারে এবং উন্নয়নের ফলে আগামী দিনগুলোতে কত রকম তথ্য, উপাত্ত ও পরিসংখ্যান বের হয়ে আসবে এবং তা আমাদের পরিকল্পনা করতে কাজে আসবে, তা এখনও আমরা কল্পনা করতে পারি না। কেঁচো খুঁড়তে সাপ বের হয়ে আসবে। উপরন্তু সারা দেশের এতগুলো স্বল্প ব্যবহৃত মোবাইলের কিছুটা ব্যবহার নিশ্চিত হবে।

 

এক কোটি মায়ের একাউন্ট খোলা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি উল্ল্যেখযোগ্য ঘটনা। রূপালী ব্যাংকের জন্যও এটি একটি বড় পদক্ষেপ। কারণ পূর্বে এই ব্যাংকের গ্রাহক সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৩ লক্ষ। আর এখন সংযোজিত হলো আরও এক কোটি। অর্থাৎ গ্রাহক সংখ্যা ৩০০% বেড়ে গেল। মায়েদের ব্যাংক একাউন্ট থাকলে নিশ্চয়ই শুধু উপবৃত্তির টাকা জমা নয় অন্য কাজেও তা ব্যবহার করতে পারবে। নারীর ক্ষমতায়নে এই একাউন্ট বিশেষ ভূমিকা রাখবে, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তুলনামূলকভাবে নিস্ক্রিয় ‘শ্রেয়তর অর্ধেকের’ যোগ্য অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে। এই প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছেএই ডেটাবেইস তৈরি করার জন্য এবং মোবাইল ব্যাংকিং পরিচালনার জন্য যে সফটওয়ার ব্যবহার করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণভাবে এদেশের ছেলেমেয়েরা তৈরি করেছে। এজন্য আমাদের বিদেশ থেকে মিলিয়ন ডলার খরচ করে সফটওয়ার আমদানি করতে হয়নি আর তা পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক হারে পরামর্শক ফি গুণতে হয়নি, যা আমাদের কোটি কোটি ডলারের সাইবার চুরির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে না। স্বদেশি সফটওয়ার ব্যবহারের ফলে আমাদের শুধু বৈদেশিক মুদ্রাই সাশ্রয় হবে না, আমাদের তরুণ কম্পিউটার বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা বাড়বে, তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে, যা জাতীয় প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক।

 

আমরা মাঝে মাঝেই ব্যাংকিং খাতে বড় বড় ঋণ খেলাপির কথা শুনি। ব্যাংকের ভেতর বড় বড় অনিয়মের কথা শুনি। এটা শুধু নিন্দুকদের আর সমালোচকদের বক্তব্য নয়, কর্তৃপক্ষ থেকে নৈরাশ্যের সুর শোনা যায়। হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েও ফেরত পাওয়া যাচ্ছে না। ফেরত পাওয়ার আশায় আরও বেশি ঋণ দিয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। সারাদেশে মায়েদের যে একাউন্ট খোলা হয়েছে সেখানে প্রত্যেক গ্রাহকের একটা করে KYC ফর্ম তৈরি হয়েছে। প্রতিটি KYC-তে মায়েদের যাবতীয় তথ্যের সাথে তার সন্তানদের বিবরণ আছে এবং শিক্ষকদের স্বাক্ষর আছে। এই KYC ব্যবহার করে রূপালী ব্যাংক এখন এই গ্রাহকদের বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সেবা দিতে পারে। যেমন এক কোটি মায়েদের মধ্য থেকে যদি আমরা দশ লক্ষ মায়ের প্রত্যেককে দশ হাজার টাকা করে ঋণ দেই, তাহলে এক হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়া সম্ভব। লক্ষ্য করার বিষয় হলো, যে KYC-তে সন্তানদের নাম এবং শিক্ষকদের স্বাক্ষর আছে, সেই একাউন্ট থেকে ঋণ নিলে ঋণ খেলাপি হবার সম্ভাবনা কম হবে। প্রতিটি ঋণের বিপরীতে যদি একজন করে মানুষের কাজ তৈরির সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে এই দশ লক্ষ ঋণের মাধ্যমে দশ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব, যা দেশের উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা রাখবে। অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে ঋণ দেওয়া নানাদিক থেকে যুক্তিসঙ্গত। বড় বড় ঋণখেলাপির আত্মসম্মানবোধ কম যার ফলে ঋণ খেলাপি হয়েও সমাজে বুক উঁচু করে মাথা উঁচু করে চলতে পারে। বঞ্চিত মানুষদের আত্মসম্মানবোধ অনেক বেশি, তাই তারা ঋণ শোধের জন্য আউলিয়া বেগমের মতো কিডনি বিক্রয় করতেও পিছ পা হয় না, যেখানে সম্পদশালী ঋণগ্রস্ত মানুষেরা তাদের সপ্তম বাড়ি বিক্রয় করতেও প্রস্তুত নয়।

 

দেশে পঞ্চাশটি ব্যাংক রয়েছে, তাদের ৮/১০ হাজার শাখা। এর জন্য আমাদের একটি ব্যাংকিং সফটওয়ার নিজেরদেরই তৈরি করা উচিত। আমাদের দেশি সফটওয়ারে যে কাজ হয় তার প্রমাণ বিভিন্ন ব্যাংকে এই সফটওয়ার চলছে। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার কাজ যেমন বিদেশিদের হাতে দিয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমানোর সুযোগ নেই, একই কথা প্রযোজ্য অর্থনৈতিক খাতেও। একটি চমৎকার দেশজ ব্যাংকিং সফটওয়ার আমাদের সকল ব্যাংকেই চলতে পারে। তাতে যেমন আমাদের কম্পিউটার পেশাজীবীদের অভিজ্ঞতা হবে, আত্মবিশ্বাস বাড়বে, ঠিক তেমনি দেশের সফটওয়ার সামগ্রী ব্যবহারে সাধারণ নাগরিকদের গর্ববোধও বাড়বে।

 

ইদানীং একটি বহুল আলোচিত বিষয় হচ্ছে সাইবার সিকিউরিটি। আমরা মাঝে মাঝেই খবরের কাগজে বিভিন্ন ধরনের সাইবার থ্রেট, সাইবার হ্যাকের কথা শুনতে পাই। এ বিষয়ে আমাদের ব্যাংকিং সেক্টরেও অনেক কথা হচ্ছে। এই অবস্থাকে পুঁজি করে প্রচুর টাকার হার্ডওয়ার এবং সফটওয়ার আমদানি করা হচ্ছে, সঙ্গে সম্ভবত আন্তর্জাতিক দামে বিদেশি পরামর্শকও। আমরা ইতোমধ্যে বিদেশি সফটওয়ার ও বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতেই বড়মাপের সাইবার হামলার শিকার হয়েছি। শুধু আমরা নই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও সাইবার এটাকের কথা পত্রিকায় এসেছে। সাইবার সিকিউরিটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছেএই বিষয়ে নিজস্ব প্রযুক্তি, সক্ষমতা এবং লোকবল তৈরি করা। এই কর্মকাণ্ডে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও আইটি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে হবে। প্রশিক্ষণ দিতে হবে, নিয়মিত সিকিউরিটি অডিট ও ড্রিল করতে হবে এবং তা বিদেশিবিমুখ থেকে। প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং প্রশিক্ষণ থাকলে বিনা পয়সার ওপেন সোর্স সফটওয়ার দিয়েও ভাল সিকিউরিটি অর্জন করা সম্ভব। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগে সাইবার নিরাপত্তার একটি দল ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। যদি সবাই মিলে একে অপরকে সহায়তা করি, প্রযুক্তি সক্ষমতা বাড়াই এবং প্রযুক্তির জ্ঞান চর্চা ভাগাভাগি করি, তবেই শুধু সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। এটা অনেকটা স্বাধীনতার মতো, নিজেদের তা অর্জন করতে হবে এবং নিজেদেরই তা রক্ষা করতে হবে। আমি মনে করিবিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রাইভেট সেক্টরের যৌথ অংশগ্রহণে আমাদের শীঘ্রই একটি জাতীয় সাইবার সিকিউরিটি রিসার্চ সেন্টার স্থাপন করা উচিত।

 

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মায়েদের একাউন্টে উপবৃত্তির টাকার প্রকল্পের বিষয়ে আমার গর্ববোধ অনেক। কারণ এর পেছনে আমাদের প্রাক্তন একজন সহকর্মী রয়েছেন যার দেশের প্রতি ভালবাসা, মমত্ববোধ, উদ্যোগী মনোভাবের জুড়ি মেলা ভার। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অধ্যাপক জাফর ইকবাল কর্তৃক ভর্তির আবেদনে মোবাইলের ব্যবহার, অতি সম্প্রতি অনলাইন সিস্টেমের মাধ্যমে সারাদেশের কলেজে ভর্তিচ্ছু প্রায় ১৫ লক্ষ ছাত্রের পছন্দমতো আসন থাকা সাপেক্ষে ভর্তির ব্যবস্থা এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কোটি মায়ের একাউন্টে উপবৃত্তির টাকা প্রেরণ ডিজিটাল বাংলাদেশের চমৎকার সাফল্যের স্তম্ভ হিসেবে গোটা জাতিকে আগামী দিনগুলোতে অনুপ্রেরণা জোগাবে।